হৈমন্তী নই বাসন্তী

(হৈমন্তীর শেষের গল্প)

নাজিয়া আফরিন

প্রিয় পাঠক, গল্পটি পাঠ শুরু করার পূর্বে রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পটি পড়ে নেয়ার বিনীত অনুরোধ রইল।                                      

এবার অপুর বাবা মা অপুর জন্য সম্ভুনাথ সেনের মত দাম্ভিক বাবার কন্যা খুজলেন না এবার মেয়ের চেয়ে মেয়ের বাবার খবরটাই

তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো ঘটক কোনো পাত্রির খোঁজ নিয়ে এলেই অপুর বাবা মা কন্যার বাবা মা কী করেন, কোথায় থাকেন, কোন গোত্র, শিক্ষা দীক্ষা কেমন তাদের পূর্ব পুরুষের কেমন নাম ডাক ছিলএবং তারা তাদের জন্য কতটা সহায় সম্পত্তি রেখে গেছেন তা বেশ ভাল ভাবে জেনে নিচ্ছিলসম্ভুনাথ সেনের মত ভদ্রবেশী, ঠক লোকের আইবুড়ো মেয়েকে ঘরে এনে যে ভুল করেছিল তা আর দ্বিতীয় বার করতে চান নাআর এমন মেয়েকে তুলে নিয়ে ভগবান তাদের রেহাই দিয়েছেন বলে ভগবানকে বার বার কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভুলেন নাতবে বিয়ের ব্যাপারে অপুর মতামতকে পূর্বে যেমন অগ্রাহ্য এবারও ঠিক তাই

 

অপু হৈমন্তীকে ভুলতে পারছে নাআঁধারে-আলোতে, নিভৃতে-নিরালে, সর্বত্র অপু হৈমন্তীকে ভেবে সারা হৈমন্তী মরে গিয়ে যেন তার সঙ্গে আর বেশি করে জুরে গিয়েছে জীবিত থাকতে যতখানি সময় সে বাবা মায়ের কারনে হৈমন্তীকে দিতে পারেনি এখন যেন সেই সীমাবদ্ধতা টুটে গেছে হৈমন্তীর প্রতি অপুর ভালবাসা যেন সীমা থেকে অসীমে পৌঁছে গিয়েছেচোখ বুঝলেই যেন হৈমন্তীকে বুকের ভিতর পাচ্ছে সে এ পাওয়ায় আর কারো প্রবেশ নেই পাশে থাকায় ভালবাসা অপু হৈমন্তীকে বুঝাতে পারেনি আজ তা ষোল আনাই বুঝাতে পারছে বাবা-মার শাসন কিংবা চোখ রাঙানো আজ আর হৈমন্তীর প্রতি তার ভালবাসাকে কমাতে পারবেনা

একদিন সকাল বেলা ঘটক সাহেব আসলো অপুর বাড়িতে বিবাহের সম্বন্ধ নিয়ে মেয়ের বাবার অঢেল সম্পত্তি কন্যার বাবার দুটো বাড়ি, একটি ছাপাখানা এসব সম্পত্তির অংশীদার বলতে আর মাত্র একটি ভাইঅপুর বাবার এই পাত্রিটিকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে। যদিও কন্যার গায়ের রং একটু শ্যামবর্ণ। বেশিদূর পড়ালেখা করেনি। গ্রামের পাঠশালায় গিয়ে চিঠি লেখা এবং দেখে দেখে উপন্যাস পড়াটি শিখেছে। এতেই বরং অপুর বাবা মার সুবিধে হল। বেশি জানাশুনা মেয়ের আবার গোমট হয়। অপুর বাবা-মা একরকম ঠিক করেই ফেললো বউ হিসেবে। অপুর মতামত জানাটা খুব আবশ্যক নয়। তাছাড়া সে কি বলবে? ঘটক অপুর মতামত জানতে চাইলে অপুর বাবা-মা সাফ জানিয়ে দেয়। এমন ছেলে আমার নয় যে আমার মতামতের উপর কোনো কথা কইবে। তবে কন্যার সোজা দাবি ছিল সে পাত্রের সঙ্গে কথা না বলে কিছুতেই মত দিবে না। এতে অপুর বাবা মা বাঁধ সাধলেও কন্যার কিন্তু এক জেদ সে পাত্রের সঙ্গে আগে কথা বলবে পরে বিয়েতে মত দিবে। হেন আস্পর্ধা অপুর বাবা মা মনে মেনে নিতে না পারলেও কন্যা বিয়ের সময় কন্যার বাপের একটি বাড়ি লিখে দেয়ার প্রতিশ্রুতির কাছে হার মেনে হজম করলেন। যথারীতি অপুর সঙ্গে কন্যার দেখা করবার ব্যবস্থা হল।

 ১০০০ টাকা নগদ পেতে এখানে ক্লিক করুন 

কোনো এক কাক ডাকা নির্জন গ্রীষ্মের দুপুরে স্টেশন থেকে একটু দূরে একটি পার্কে দুজনের দেখা করার ব্যবস্থা হল। সেখানে দুজনের যে কথা হল- তার সারমর্ম এই যে, বিবাহের কন্যা অপুর বিবাহ সম্পর্কে মত জানতে চায়। থাক, আর বিবাহের কন্যা না বলে কন্যার নাম খানা উল্লেখ করেই ফেলি। কন্যার নাম বাসন্তী। বাসন্তী অপুর কাছে বিবাহের আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইলে অপু অস্বীকার করে জানায়, সে তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হৈমন্তীকে ভুলতে পারছে না এবং হৈমন্তীর মধ্যে যে ভালবাসার সন্ধান সে পেয়েছে তা ভুলে পৃথিবীর আর কোনো সুখের মধ্যে ডুবে থাকা সম্ভব নয়। হৈমন্তী কোনো একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু ছিল না। সে ছিল অস্পর্শীয়, স্বর্গীয়। তাকে শুধু ভালবাসা যায়। এবার বাসন্তী নড়ে চড়ে বসলো। বলল এত ভাল যখন বেসেছিলেন তবে তাকে খুন হতে দিলেন কেন? অপু হতভম্ব হয়ে বলে, কি সব আবল তাবোল বলছেন। সে খুন হতে যাবে কেন? সে আমার উপর অভিমান করে চলে গিয়েছে। আমি তার যোগ্য ছিলাম না তাই। বাসন্তী এবার বলল, আইহনও তো রাধার যোগ্য ছিল না। তথাপিও তপস্যা করে পেয়েছিল এবং আরাধনা দিয়ে ধরে রেখেছিল । আপনি তাহলে পারলেন না কেন? সে ঈশ্বরের অমূল্য সম্পদ তাই ঈশ্বর তাকে জগতের ধূলিকণায় পঁচে মরতে দেয়নি। সে নিজের কাছে নিয়ে সর্গের সম্রাজ্ঞী বানিয়ে রেখেছে। অভিমান করে যায়নি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সে অত সহজে হার মেনে যাওয়ার মেয়ে নয়। সে তার বাবার আদর্শে গড়া মানুষ। অপু এবার একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি এত কিছু জানেন কীভাবে? আপনি কে? বাসন্তী বলল, আমিই তো তার সবথেকে কাছের জন। এক সঙ্গে বেড়ে ওঠা দুজন দুজনার সুখ- দুঃখের কত আলাপন। দুজন একসঙ্গে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছি । অপু বলল আপনি মাধ্যমিকে পড়েছেন? শুনলাম আপনি নাকি বড়জোর গ্রামের  পাঠশালা পর্যন্ত পড়েছেন? বাসন্তী এবার একটু হেসে বলল, শিক্ষিত কন্যা বিয়ে করাতে আপনার বাবা মার বড্ড ভয়। তাই একটু মিথ্যা বললাম। অপু বলল, মিথ্যা বলা কেন? আমাকে আপনার বিয়ে করতেই হবে? বাসন্তী বলল, হ্যাঁ। বলেই  একটু লজ্জিত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অপু বলল, মানে ঠিক বুঝলাম না। বাসন্তী বলল আমার প্রাণের সখি ছিল হৈম। ছেলেবেলা থেকে আমরা অবাধ স্বাধীনতায় মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে বেরিয়েছি। বহু সীমানা প্রাচীর আমরা ডিঙ্গিয়েছি। হৈম যখন প্রাণ খুলে হাসতো তখন তাকে কি যে অপূর্ব লাগত। আমি মেয়ে হয়েও তার প্রেমে পড়ে গেছি বারবার। সে ছিল খুব উদার মনের মানুষ। বলতে বলতে খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, জানেন একবার কী হয়েছিল? একবার আমরা রেলের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম রেলের উপর একটি কুকুর ছানা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটি ট্রেন ছুটে আসছিল। এ অবস্থা দেখে হৈম তো এক দৌড়ে গিয়ে কুকুর ছানাটিকে উদ্ধার করে আনলঅল্পের জন্য নিজে ট্রেনের নিচে কাটা পড়া থেকে বেঁচে গেল। আর প্রজাপতির পিছনে যে ছুটে চলেছে কত! প্রকৃতিতে এলেই তার ডানা ঝাপটানো আর হাসির ফোয়ারায় যেন প্রকৃতি আরো সুন্দর হয়ে উঠত। এবার অপু বাসন্তীর কথায় আর আগ্রহী হয়ে উঠল। সে বলল, তাই? তার এমন প্রানোচ্ছাস রূপ তো কখন দেখিনি। দেখবেন কিভাবে? বাসন্তী বললো,আপনার তো সে চোখই ছিল না। চোখ থাকলে আর কত কিছুই দেখতে পেতেন। অপু বলল আর অনেক কিছু মানে? বাসন্তী বললো, সে যে প্রচণ্ড লিখনীর হাত ছিল তা কি আপনি জানতেন? সে নিয়মিত ডায়রি লিখত আর কবিতা লেখায় ছিল অসাধারন নৈপুন্যঅপু বাসন্তীর কথা যত শুনছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে চোখে মুখে এক অবারিত সুখের ঝলক টেনে বলল, এত প্রতিভা ছিল ওর! আর আমি কিছুই টের পাইনি? সত্যিই! দেখলেন তো আমি ওর কতটা অযোগ্য ছিলাম বাসন্তী এবার মুখের রেখায় একটু আক্ষেপ টেনে বললেন, জানবেন কিভাবে? আপনারা তো ওর বাবার সম্পত্তির দিকে হা করে ছিলেনএত বড় সম্পদ যে আপনার ঘরে দিয়ে দিল তার এত টুকু মূল্য বুঝলেন নাসে লুকিয়ে ডায়রি লিখত অবশ্য এ অভ্যাস তার ছোটবেলা থেকেই বিয়ের পরও তার নিত্য দিনের সমস্ত ঘটনা আপনাকে ঘিরে তার প্রত্যাশা সমস্ত কিছু তার ডায়রিতে লিখে গেছেঅপু নিজেকে আর সংবরণ করতে পারছে নাবলে ডায়রি? ডায়রি কোথায়? বাসন্তী বলল আমার কাছে অপু খুব বিনয়ের সঙ্গে বাসন্তিকে বলল, ওর ডায়রিটা আমাকে দিন প্লিজ বাসন্তী ঠিক ততটাই কঠোর হয়ে বলল, না যাকে আপনি বুঝতেই পারেননি আজ তার কোনো জিনিসই আপনার পাওনা নয়। তাছাড়া সে যদি মনে করত তাহলে আমার কাছে রেখে না গিয়ে আপনার কাছেই রেখে যেত। আমাকেই যখন ভরসা করে দিয়ে গেছে তখন তার মূল্যায়ন আমাকে করতে হবে। তবে আপনার প্রতি আমার একটু করুণা আছে। বলতে পারেন হৈমন্তীর কথা ভেবেই আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি। নয়তো আপনার মত হ্যাবলা, অপদার্থ, মেরুদণ্ডহীন পুরুষকে আমি কখনোই বিয়ে করতে চাইতাম না। এবার অপুর মুখখানা একেবারে মাটির দিকে স্থির হয়ে গেলো। যে সে সেখান থেকে পালাতে পারলে বেঁচে যায়। বাসন্তী আবার বলতে শুরু করলো, হৈমন্তীর মত মেয়েকে যে বুঝতে পারলো না সে আমার মত ঠোটকাটা মেয়েকে কীভাবে বুঝবে? যাহোক, হৈমন্তী তার মনের অনেক কথা আমাকে বলেছে। বলেছে তার অনেক অপূর্ণ ইচ্ছার কথা। একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাসন্তী বললো, সে যাকগে, আপনার প্রতি অনেক অনধিকার চর্চা করে ফেললাম। আজ আসি। পারলে আমাকে ক্ষমা করবেন। বলে দুজনই সেখান থেকে বিদায় নিল।

অপু ঘরে দরজা বন্ধ করে কপালের উপর হাত রেখে শুয়ে অনেকক্ষণ বাসন্তীর কথা ভাবলো। ভাবছে, তাকে দেয়া বাসন্তীর মেরুদণ্ডহীন পুরুষ উপাধিটিই বোধহয় যথার্থ নয়তো প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীকে সে এত ভালোবেসেও বাবা মায়ের কথার অত্যাচার থেকে বাঁচাতে পারেনি। বাসন্তীর একথাও সত্য যে হৈমন্তীকে আমরা হত্যাই করেছি বটে। কথার বাণে জর্জরিত করে হৃদয়টাকে ফালাফালা করে হত্যা করেছি। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে পড়লো বাসন্তী হৈমন্তীর কী যেন এক ইচ্ছার কথা বলেছিল। তাতো জানা হলো না। অনেক কিছু ভেবে সে ঠিক করলো যে বাসন্তীকে বিয়ে করা চলে। যার সঙ্গে হোইমন্তীর এত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সান্নিধ্যে এলেই হৈমন্তীকে পাওয়া হবে। অজানা হৈমন্তীকে জানা যাবে। তারচেয়ে বড় কথা তাকে না হৈমন্তীর লালিত স্বপ্নগুলো সে বাসন্তীর সাহায্যে পূরণ করতে পারবে। এতদিন ধরে বিয়েতে আপত্তি করলেও আজ সে নিজে গিয়ে তার বাবা মাকে বাসন্তীকে বিয়ে করার সম্মতি জানিয়ে এলো। অপুর মা-বাবা যদিও তার সম্মতির অপেক্ষায় নেই। তারা বেশ আটঘাট বেধেই বিয়ের সমস্ত আয়োজন করছিল। তবে তা আর মহাসমারোহে লোক জড়ো করে নয়। একেবারেই ঘরোয়াভাবে। 

 ১০০০ টাকা নগদ পেতে এখানে ক্লিক করুন 

বিয়ের মহাপর্ব সমাপ্ত হলো। সকল আয়োজন সাঙ্গ করে যে যার মত চলে গেলো। কন্যা বিদায়ের কালে বাসন্তীর বাবাকে একেবারেই আপ্লুত দেখা গেল না। বিদায় যাত্রার সামনে অপু এবং অপুর বাবা সকলের সামনে বললো, বাবাজি, বেয়াই, আমি আমার মেয়েটাকে একেবারে একা আপনাদের সঙ্গে পাঠাচ্ছি। এর আগে মেয়ে আমার কখনো একা কোথাও যায়নি। প্রয়োজন পড়েনি। তব এজন্য আমার মোটেও কষ্ট বা ভয় ভয় হচ্ছে না। আমার কন্যার প্রতি আমার যথেষ্ট ভরসা আছে। সে যেকোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। সে নিজেকে ভালো রাখতে পারবে। আশা করি যে সে আপনাদেরও ভালো রাখতে পারবে। এই বলে পাত্রপক্ষ বিদায় নিল।

নতুন বউ নিয়ে অপু বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলো। পাড়া-প্রতিবেশি সকলেই ঘুমিয়ে পড়লেও কিছু কিছু উৎসুক প্রতিবেশি নতুন বউ দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল। নতুন বউ বাড়িতে ঢুকতেই সকলে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সকলের এ হট্টগোল দেখে নতুন বউ বলে উঠলো, দিদিরা কিছু মনে করবেন না। এখন তো অনেক রাত হয়ে গেছে। আপনারা আগামীকাল এসে যত ইচ্ছে গল্প করে যাবেন। নতুন বউ বাড়িতে প্রবেশ করেই এমন কথা বলাতে অপুর মা বলে উঠলো, এ কী কথা বউমা? তুমি নতুন বউ, এখন তোমার কীসের কথা! তাছাড়া তারা সবাই তোমাকে দেখতে এসেছেন। এবার বাসন্তী একটু তার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে বললো, আপনার জেনে রাখা ভালো মা, আমি হৈমন্তী নই, বাসন্তী। আমি একটু কথা বলবই। তাছাড়া আমি তাদের কী এমন খারাপ কথা বলেছি ? আমিতো চলে যাচ্ছি না। সবে এসেছি। একটু ক্লান্ত। শুধু সকালে আসতে বলেছি। অবশ্য একথা শোনার জন্য উৎসুক জনতা বসে নেই। তারা বাসন্তীর মুখে প্রথম বুলি ফুটতেই চলে গেছে। অপুর মা বুঝে গেছে তার এখন আর কোনো কথা বলা ঠিক হবে না। সে যে আসলেই হৈমন্তী নয় যে সমস্ত চুপচাপ সহ্য করবে একথা তার ঢেড় বুঝা হয়ে গেছে।

 ১০০০ টাকা নগদ পেতে এখানে ক্লিক করুন 

বাসরঘর। হাটুতে মুখ গোজে খাটের উপর বসে আছে বাসন্তী। অপু ঘরে প্রবেশ করেই জিজ্ঞেস করল আপনি কি হৈমন্তীর ডায়রিটা সঙ্গে এনেছেন? সে আমার সম্পর্কে আপনার কাছে আর কী বলেছিল? বাসন্তী এবার একটু সোজা হয়ে বসলো। এবং তার দিকে তিক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর বললো, হৈম আমাকে ঠিকই বলেছিল। আপনাকে মেরামত করার অনেক কিছু আছে। অপু বললো, মানে? বাসন্তী বললো, মানে বুঝতে যোগ্যতার দরকার, যেটা আপনার নেই। এবার একটু রেগে গিয়ে বললো, চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ুন। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। কাল কথা বলব। অপুও সুবোধ বালকের মত আর কথাটি না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালবেলা, পাড়ার কাকিমা, জেঠিমা, বোউদিদিরা সকলে অপুর বউ দেখতে এলো। তারা অনেকে অনেক রকম কথা বললো। কেউ কেউ তার রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ আবার বাপের বাড়ি থেকে কী কী নিয়ে এসেছে সে কথাও বললো। একজন ঠাকুমা তো হাসির ছলে বলেই বসল, ওমা এই বউটারও তো বয়স বেশিই মনে হচ্ছে। তারপর বাসন্তী এগিয়ে গিয়ে সেও মুখে একটা হাসির রেখা টেনে বললো, বেশি মনে হচ্ছে না ঠাকুমা?। আসলেই আমার বয়স বেশি। ২১ বছর। আপনার কোনো সমস্যা আছে? অপুর মা এবার বউমাকে একটু থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বললেন, বউমা উনারা তোমার গুরুজন। ওনাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলে না। তাছাড়া তারা কী এমন ভুল বলেছে? আমাদের সমাজে মেয়েদের এত বেলা করে বিয়েথা হয় নাকো। তাই তিনি একথা বলেছেন। বাসন্তী আবার বললো, বিয়ের সময় এত এত টাকাকড়ি যৌতুক চাইবেন, তারপর আবার কচি বউ? একসঙ্গে তো এত কিছু পাওয়া যায় না ঠাকুমা। তাছাড়া আপনার নাতির বয়স তো আটাশ বছর। আমার থেকে সাত বছরের বড়। তার বেলায় কিছু নেই, তাই না? ঠাকুমা বললো, দেখ বউ মা, আমাদের সমাজে পুরুষের বয়স কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু মেয়ের বয়স এগারো কিংবা বারোর বেশি হতে নেই। ওমা ওমা বলেন কী? তাহলে একেবারে বাপের বয়সী হলো। অপুর মা বললো, তুমি অনেক কিছুই বুঝ না বউ মা। তুমি চুপ করো। বাসন্তী বললো, কেন মা, এইতো বললেন, আমার বয়স অনেক বেশি। তবে বুঝব না কেন? অপুর মা বললো, তুমি তোমার ঘরে যাও বউ মা। বাসন্তী চলে যাচ্ছিল। অপুর মা আবার প্রতিবেশিদের সঙ্গে বড়াই করে বউমার বাপের বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।  বললো, বউমার বাবা তো আমার ছেলের নামে একটা বাড়ি লিখে দিচ্ছে। বাসন্তী যেতে যেতেই তা শুনে ফেললো। আবার ঘুরে এসে শাশুড়ির সামনে দাঁড়ালো। শাশুড়ির কথাকে একটু সংশোধন করে বললো, আপনার ছেলেকে আমার বাবা বাড়ি লিখে দিতে যাবেন কেন? অপুর মা বললো, সে কী কথা বলছো বউ মা? বিয়ের আগে তো তোমার বাবা সেই রকমই কথা বললেন। বাসন্তী বললো, বাবা বলেছে ঠিকই কিন্তু আপনারা শুনতে একটু ভুল করে ফেলেছেন। বাবা বলেছেন, কলকাতার বাড়িটা আমার মেয়ের নামে করে দিব। তা ঠিকই তো বললাম আমি। বললো অপুর মা। মেয়েকে দিবেন মানে তো মেয়ের জামাইর নামেই দিবেন। মেয়ে ছেলের নামে আবার সম্পত্তি হয় নাকি? তখন ঠাকুমা আবার বলে উঠলেন, কী বউমা এনেছিস লা অপুর মা? বউমার তো বড্ড চোপা। কথায় কথায় কোনো কথাই ছাড়ছে না দেখছি। আহারে বেচারি হৈমন্তী! কী ভালো মেয়েটাই না ছিল। দশ কথায় মুখে রা ছিল না। চুপচাপ সব কিছু শুধু শুনত। এবার বাসন্তী যেন উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে গেল কথা বলার জন্য। সে বললো, তা সেই সহ্যশীলা বউটিকে আপনারা কী মূল্য দিয়েছিলেন? তাকে যখন উঠতে বসতে কথার বানে জর্জরিত করা হতো তখন কি আপনারা এসে তার হয়ে কোনো কথা বলেছিলেন? ঠাকুমা, দেখ বাপু! অন্যের সংসারের ব্যাপার। তা আমরা বাইরের লোক কী বলবো বলো দেকিনি? বাসন্তী বললো, এখনো তো আপনারা বাইরের লোক। আমার বয়স বেশি, আমার বাপের বাড়ি থেকে কী এনেছি? আমার এত চোপা কেন? এসব তো ঠিকই বলছেন। এখন মনে হচ্ছে না যে অন্যের সংসারের ব্যাপারে এত কথা বলতে নেই? ঠাকুমা এবার চুপ হয়ে গেলো। অপুর ভেতরের কক্ষ থেকে শুনতে পাচ্ছিল যে বউ আর প্রতিবশির মধ্যে কিছু একটা গণ্ডগোল বেধে যাচ্ছে, তাই সে দ্রুত ঘর থেকে এসে বাসন্তীকে কিছু বলতে যাবে অমনি বাসন্তী তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আপনি থামেন। প্রমাণ হয়ে গেছে যে আপনি কিছু না। আগে যেমন কিছু বলেনন ,এখনো তেমনি চুপ করেই থাকবেন ।অপু চুপ হয়ে যায়। ফিরে যেতে থাকে আর মনে মনে বলে, তুমিই এ ঘরের যথার্থ বউ। যাক, এটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে হৈমর মত তোমাকে আর আমার অকালে হারাবার নেই। তোমার বাবা ঠিকই বলেছিলেন যে তুমি নিজেই ভালো থাকতে জান।

 1000 টাকা নগদ পেতে এখানে ক্লিক করুন 

বেশ কিছুদিন পার হয়ে গেলো। অপুর মা খুব চেচামেচি করছিল বাসন্তীর বাবা তার ছেলের নামে বাড়ি লিখে দিবে বলেও এখনো লিখে দিচ্ছে না বলে। মেয়েকে দিয়ে তার কাছে খবর পাঠানো হলো। যথারীতি বাসন্তীর বাবা উকিলবাবুকে নিয়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। এসেই প্রথমে বাসন্তীর ঘরে বসে তার সঙ্গে আলাপ করলেন। বাসন্তী তার বাবাকে পুনর্বার সাবধান করে দিলেন। বললো, বাবা ভদ্রতা কিন্তু ভদ্রলোকদের জন্য। এরা প্রচণ্ড লোভী। আর তুমি যদি বিনয়ের সঙ্গে কথা বল তাহলে তারা নিশ্চিত ভেবে নিবে যে তুমি দুর্বল। হ্যাঁ, তবে তোমার স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়েও কথা বলতে বলছি না। শুধু বলছি, তুমি যা করবে, যা বলবে সব ভেবেচিন্তে। বাসন্তীর বাবা বললেন, তুই কোনো চিন্তা করিস না মা। আমিতো তোরই বাবা। আমার উপর ভরসা রাখ। বাসন্তী বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ভরসা তো আছেই বাবা। আমিতো তোমার আদর্শেই লালিত। শুধু এই নতুন মানুষগুলোর ব্যাপারে তোমায় একটু সাবধান করাম। তুমিতো এখনো তাদের জেনে উঠতে পারনি। আচ্ছা মা, ঠিক আছে। হেসে বললো বাসন্তীর বাবা।  

1000 টাকা নগদ পেতে এখানে ক্লিক করুন 

অপুর মা, অপুর বাবা, বাসন্তীর বাবা ও উকিলবাবু বসে আছেন একটি কক্ষে। বাসন্তীর বাবা কাগজ-পত্র সবকিছু রেডি করেই এনেছেন। শুধু তাদের সামনে বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন বলে সঙ্গে উকিলবাবুকে নিয়ে এসেছেন। উকিলবাবু উইলখানা পড়ে শুনিয়ে দিলেন। উকিলের কথাগুলো শুনে অপুর মা বেশ চটে গেলেন। সেখানে এরকম লেখা ছিল যে বাসন্তীর বাবা অর্থাৎ শ্রী হরিশচন্দ্র দেবনাথ তার কলিকাতার বাড়িখানা তার কন্যা শ্রীমতি সকুন্তলা দেবনাথ অর্থাৎ বাসন্তীর নামে লিখে দিয়েছেন। শুনে অপুর মা চিৎকার করে উঠলেন। নামের জায়গায় তো দেখছি বেয়াই মশাই আপনি আপনার মেয়ের নাম লিখেছেন। হরিশচন্দ্র বললেন, কেন বেয়াইন মহাশয়া? সেরকমই তো কথা ছিল।

অপুর মা: সেরকম কথা ছিল মানে? আপনি তো বলেছিলেন এই বাড়িটা আপনি আপনার জামাইর নামে লিখে দিবেন।

হরিশচন্দ্র: না বেয়াইন মশাই। আপনি কিঞ্চিৎ ভুল শুনেছেন। আমি বলেছিলাম বাড়িটা আমি আমার মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে দান করব।

অপুর মা: সে কথাই তো হলো। মেয়ে ও মেয়ে জামাইকে দান করা মানে তো জামাইর নামেই লিখে দেয়া।

হরিশচন্দ্র: মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে দান করা মানে জামাইর নামে লিখে দিয়া হবে কেন? মেয়ের নামে নয় কেন?

অপুর মা: দেখুন বাপু, অত-শত জানি না আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন শুধু এইটুকুন বলে দিলাম

এবার অপুর বাবা মুখ খুললেন বললেন, বেয়াই মশাই, আপনাকে আমি বুদ্ধিমানই ভেবেছিলাম আপনি যে এত বোকা তাতো জানতাম না মেয়েছেলের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেন? তা কখনো হয়? সম্পত্তির মালিকানা পেলে মেয়ে মানুষের গোমট বেড়ে যায় তার মধ্যে কখনো পতিভক্তি থাকে? তাছাড়া মেয়ে ছেলে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ বুঝে কিছু?

হরিশচন্দ্র: নিজের মেয়েকে বাদ দিয়ে পরের ছেলের নামে সম্পত্তি লিখে দেয়ার মধ্যে কী বুদ্ধিমত্তাটা দেখলেন আপনি? বরং আমি যদি নিজের মেয়ের নামে লিখে না দিয়ে আপনার ছেলের নামে লিখে দিতাম তাহলেই বরং আমার বোকামি করা হতো। আর সম্পত্তি রক্ষনাবেক্ষণের কথা বলছেন তো? আমার মনে হয় সেটা অন্তত আপনার ছেলের থেকে আমার মেয়ে সে কাজটা খুব ভালোভাবে করতে পারবে। তাছাড়া ভয় পাচ্ছেন কেন? আমার মেয়ের নামে দিয়েছি মানে তো আপনার ছেলে তা ষোলআনাই ভোগ করতে পারবে। আর আমি আমার মেয়েকে যতটুকু জানি, সে আপনাদেরও কখনো ঐ বাড়ি থেকে বের করে দিবে না। এমনকি খোটাও দিবে না। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।

অপুর মা মুখ বেঙচিয়ে ভললো, বয়েই গেছে আপনার মেয়ের বাড়িতে থাকতে। এবার বাসন্তীর বাবা একটু মুচকি হাসলো শুধু। ততক্ষণে বাসন্তী আর অপুও সেখানে উপস্থিত হলো। সে বাসন্তী আর অপুকে লক্ষ করে বললো, এবার তাহলে আসি মা। আর অপুর কাছে গিয়ে বললো, সেই উপায় নেই বাবা যে তোমায় বললো আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো। তবে হ্যাঁ, একথা বলতে পারি যে, আমার মেয়ে তোমাকে দেখে রাখবে। নেহাৎ আমার মেয়ে জেদ করলো যে তোমায় বিয়ে করবে, নয়তো আমি... আমার মেয়েকে আমি জানি, সে যখন কিছু চায় তখন তাতে অবশ্যই ভালো কোনো উদ্দেশ্য থাকে। তবে বাবা, তোমায় আশীর্বাদ করি যেন আমার মেয়েটিকে বুঝতে পারো। তাতে তোমারই ভালো হবে। ইশ্বর তোমার সহায় হোন।  এই বলে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।

রাত্রিবেলা। সমস্ত সামাজিক কোলাহল শেষ হলো। বাসন্তী উইলখানা হাতে অপুর সামনে। উইলখানা অপুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আপনি যদি চান তাহলে আমি উইলের নামখানা পরিবর্তন করতে পারি। অপু বাসন্তীর হাত থেকে এক ঝটকায় উইলখানা নিয়ে বিছানার উপর ছোড়ে মারল। তারপর বাসন্তীর দুহাত শক্ত করে ধরে বললো, আমি মানুষ। একটা সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। একথা প্রমাণ করার একটা শেষ সুযোগ আমায় দাও। আমি আর কিছু হারাতে চাই না। আমাকে কৃপা করো- বলতে বলতে হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো। বাসন্তী তার দুহাত ধরে টেনে তুলে তাকে বিছানায় বসাল। তারপর বলো, আমি বিশ্বাস করি, ঠিক এই মুহূর্ত থেকে আপনি একজন সুপুরুষ। যতদিন পর্যন্ত মানুষের চোখ অন্ধ থাকে এবং বুঝতে পারে না সে কী। ততদিন তার পরিবর্তন কেউ করতে পারে না। আজ আপনি যেহেতু বুঝতে পেরেছেন আপনার অযোগ্যতা ঠিক কোথায়, তাই বলছি-আজ থেকে আপনার মধ্যে আর কোনো অযোগ্যতা নেইতারপর অপুর পাশে বসে তার হাতটি ধরে বললো, হৈমন্তী খুব স্বপ্ন পাগল মানুষ ছিলবিয়ে এবং দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে তার অন্য রকম ধারণা ছিল। তার অনেক স্বপ্ন ছিল আপনাকে নিয়ে। অনেক প্রত্যাশা ছিল আপনার থেকে। আমাকে সব বলে গেছে। ডায়রিতেও লিখে গেছে। এবার অপু আরো কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বাসন্তীর বুকে মুখ গুজে শিশুর মত হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। বললো, আমি আমার অযোগ্যতার কারণে হৈমন্তীকে হারিয়েছি। এত দুঃখ তার বুকে চাপা ছিল যে আমাকে কোনো দিনও বলেনি। আমিও বুঝতে পারিনি তাকে। তারপর বাসন্তীর হাত চেপে ধরে বলো, কথা দাও তুমিও হৈমন্তীর মতো অভিমান করে কখনো আমায় ছেড়ে যাবে না। আমিও কথা দিচ্ছি, আজ থেকে আমি একজন সত্যিকার সুপুরুষ হয়ে থাকব তোমার জীবনে। এভাবে অনেকক্ষণ চললো অপুর পাগলামি। বাসন্তী তাকে সেবারের মত শান্ত করলো।

এভাবে তাদের দিন বেশ চলছিল। তবে অপুর মা কিন্তু বাসন্তীকে দিনরাত কথা বলতে ছাড়ছিলো না। আর বাসন্তীও তাকে বুঝিয়ে দিতে থাকলো যে ‘আমি হৈমন্তী নই, বাসন্তী’।