অভাগিণী মা
আমি কিং কলেজ, লন্ডন থেকে মেডিসিনে স্নাতকোত্তর কোর্স সম্পন্ন করেছি। গতকাল মাত্র পরীক্ষা সম্পন্ন করলাম। শুধু সার্টিফিকেট
পাওয়া বাকি। এবার দেশে ফিরে যাওয়ার পালা। আমার অভাগিনী মা আমার পথ চেয়ে বসে আছে। তার পথ চাওয়ার
অবসান ঘটাতে হবে আমাকে। এই যে আজ আমি লন্ডনের মত দেশে
ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি, এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মায়ের। এই পুরো কোর্সটি
সম্পন্ন করেছি আমি পুরো দাপটের সঙ্গে। ক্লাসে আর কাউকে আমি কোনো পরীক্ষায় এক নম্বর
বেশি পেতে দেইনি। এর সাফল্যও আমার মায়ের। তিনি এত বেশি সম্পদশালী, এত বেশি জ্ঞানী
যে আমাকে সব সময় ভরিয়ে রেখেছেন। যার জন্য আমাকে কখনো কোনো অভাব বোধ করতে হয়নি। তাই
আমি মন দিয়ে পড়াশুনাটা করতে পেরেছি। আমার মা আমাকে যে পরিমাণ দিয়েছেন সে তুলনায় এই
অর্জন আমার অতি ক্ষুদ্র। আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। আজ আমি নিজের কথা বলতে
আসিনি। আজ আমি আমার সেই মায়ের কথা বলব। আমার অভাগিনী মায়ের কথা, আমার দুখিনী মায়ের
কথা।
আমার মায়ের যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়স ষোলো কী সতেরো হবে। আমার
বাবার ছিল ছোট্ট একটি দোকান। আপনারা কিছু মনে করবেন না, আমি আমার বাবাকে ‘ঐ লোকটা’বলেই সম্বোধন করবো। দোকান থেকে যা আয় হতো তা দিয়ে আমার মা, ঐ লোকটা এবং ঐ লোকটার
মা-বাবার বেশ ভালো দিন চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঐ লোকটার ছিল বিনা পরিশ্রমে বেশি
টাকা পেয়ে যাওয়ার লোভ। তাই সে প্রতিদিন সারাদিন দোকান চালিয়ে রাতে মেতে উঠতো জুয়া
খেলায়। যেদিন জুয়ায় জিতে যেতেন সেদিন ঘরে এসে
মায়ের সঙ্গে কিছুই করতেন না। তবে যেদিন হেরে যেতেন সেদিন মায়ের কপালে জুটতো
শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন। সঙ্গে ওই লোকটার মা-বাবাও আমার মায়ের পানে তেড়ে
আসতেন। দু-চার ঘা দিতেন। যেন আমার মায়ের জন্যই সব হয়েছে। তখনো আমি জন্মাইনি। সব
মায়ের কাছে শুনেছি। আমার মা কখনোই মুখ ফোটে কিছু বলার সাহস পায়নি। বিয়ের দিন থেকেই
মায়ের উপর বিভিন্ন কারণে-অকারণে চলেছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মাকে মেরে তার
বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিত টাকা নিয়ে আসতে। আমার মায়ের বাপের বাড়ির অবস্থাও তেমন
ভালো ছিল না। ছয় সন্তানের ভরণ-পোষণে নানাজান আর পেরে উঠছিলেন না। আমার মাকে কোনো
রকম ঘার থেকে আহারের মুখ কমানোর জন্য যার তার হাতে তুলে দিয়ে একটা খাবারের মুখ কমালেন।
ঐ লোকটার মার খেয়ে মা যখন তার বাপের কাছে গিয়ে উঠে তখন নানাজানের অবস্থা মার খাওয়া
সন্তানের প্রতি করুণা নয় বরং হয়ে উঠে বিরক্তের কারণ। শুনেছি মায়ের বিয়ের সময় নাকি
ঐ লোকটাকে একটি সাইকেল ও কুড়ি হাজার টাকা নগদ দিতে হয়েছিল। সেই ধারই এখনো শোধ
হয়নি। পরিবারের এতগুলো লোকের আহার জোটানোর পর আবার আমার মায়ের বাড়তি টাকার আবদার
এসব কিছুই বাব সহ্য করতে পারছিলেন না। নানাজানের এমন মুখের চুপসে আবস্থা দেখে মা
আর সেখানে থাকেনি। আবার মার খাওয়ার জন্য ঐ লোকটার কাছেই ফিরে গেলো। স্বামী নামক
জন্তুটা দিনের পর দিন তার প্রতি হিংস্রাত্মক হতেই থাকলো। ঐ লোকটার বাবা মা-ও জোট
বধে আমার মায়ের প্রতি নিয়মিত শারীরিক মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যেতে থাকল। জুয়ার
ময়দানে লোকটা তার সর্বস্ব দিয়ে দিলেন। এমনকি শেষ ভরসা দোকানটাও। আমার মা সারাদিন
অন্যের বাড়ি কাজ করে তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। আর রাত হলে নিজে ঐ জন্তুটার মার
খেয়ে নিজের উদরপূর্তি করতেন। মা তবুও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারলেন না। কারণ, আমার
মায়ের সমাজ পরিবার আমার মাকে শিখিয়েছে স্বামী যেমনই হোক মেয়েদের বিয়ের পরে শ্বশুর
বাড়িতেই থাকতে হয়।
কিছুদিনের মধ্যে মা তার উদরে আমার অস্তিত্ব টের পেলেন। প্রথম
দিকটায় এই খবরে ঐ লোকটা খুশি হলেও এক রাতে মায়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়। জিজ্ঞেস
করে মাকে, পেটে কোনো সমস্যা হয় কিনা। এই প্রথম মা খুশিতে আপ্লুত হয়। তার স্বামী এই
প্রথম তার সঙ্গে একটু নরম স্বরে কথা বলেছে বলে। তার শরীরের খোজ নিয়েছে বলে। বাঙালি
নারী এর বেশি আর কিছুই চায় না। সে খুশিতে একটু লজুক হাসি হেসে জানায় যে তার কোনো
সমস্যা নেই। তারপর লোকটা বলে- দেখ বউ, এতদিন তোর লগে যা-ই করছি দেখিস পোলা হইলে আর
জীবনে তোর লগে আর খারাপ ব্যবহার করুম না। মা
এবার বাঙালি নারীর চিরায়ত আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললো, তা আমারে কন ক্যান? আমি কি
পোলা মাইয়া বানামু নাকি? আল্লায় যেইডা দিব হেইডাই অইব। ঐ লোকটা বললো, তুই জানস না
মানে? তোর কোন দোষ না থাকলে তো আমার পোলাই হইব। তারপর মায়ের দিকে একটু তেড়ে গিয়ে
বললো, দেখ তোকে এখনো কইতাছি, কোনো দোষ থাকলে আমারে বল। আল্লায় যা দেয়ার দিব বইলা
নিজের দোষ ঢাকনের চেষ্টা করিস না। পরে কিন্তু মাইয়া পয়দা কইরা আমার ঘারে চাপাইস
না। তখন মা বুঝলো যে সয়তানের হিংস্র রূপ এক্ষুণি বেড়িয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতে মার
খাওয়া যাবে না। আমার যেমন-তেমন এই সময়ে মাইর খেলে আমার সন্তানের ক্ষতি হইতে পারে।
তাই পরিস্থিতি বুঝে সেবারের মত মা চুপ হয়ে গেলো। বললো, আপনি এত অধৈর্য হন ক্যান?
আমি বলছি, আমার কোনো দোষ আছে? দেইখেন, আপনের পোলাই অইব। মনে মনে কিন্তু মা ছেলে
কিংবা মেয়ে দুজনকেই ভালোবেসে গ্রহণ করে নিয়েছিল। শুধু জন্তুর হিংস্র থাবার হাত
থেকে আমার মা তার সন্তানকে বাঁচাতে এই প্রথম প্রতারণার আশ্রয় নিল। মনে মনে জানত
যদি তার কন্যা সন্তান হয় তাহলে তার দুর্দশার অন্ত থাকবে না। তবে ছেলে হোক বা মেয়ে
হোক, দুজনকেই মা সমান গুরুত্ব দিয়ে মানুষ করবেন বলে সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিলেন। মায়ের
এই কথায় ঐ লোকটার কাছে মায়ের গুরুত্ব খানিকটা বেড়ে গিয়েছিল। পুত্র সন্তান পাওয়ার
লোভে মাকে একটু বেশি খাতির যত্ন করতে থাকলো লোকটা। তার পুত্র সন্তানটি যেন বড় হয়ে
সুপুরুষ হয় সেজন্য মাকে ভালো ভালো খাবারও দিতে থাকলো। এমনকী মায়ের অন্যার বাড়িতে
কাজ করতে যাওয়াও বন্ধ করে দিল। বউয়ের প্রতি ছেলের যত্ন এমন বেড়ে যাওয়ায় লোকটার
মা-বাবা এসে মাকে কড়া গলায় বলে গেলো- দেখ বউমা আমার ছেলেটা কিন্তু বড্ড আশা করে
আছে। তাকে তুমি ঠকিও না। মা চুপচাপ শুধু শুনে। মা বুঝে যায়, সত্য হোক কিংবা
মিথ্যে, এই মুহূর্তে তার শরীরের এই বাড়তি যত্ন ও ভালো খাওয়া তার পেটের সন্তানের
জন্য প্রয়োজন। তাই আপাতত তার সন্তানের ভালোর জন্য তাদের সঙ্গে কথায় কথা মিলিয়েই
থাকতে হবে। পরেযা হয় হবে। এই মুহুর্তে তার ভালো থাকাই সন্তানের ভালো থাকা। তার
ভালো খাবারই সন্তানের সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা। তাই সে শেষ দিনটার অপেক্ষা করতে
থাকে। যে হিংস্র পশুটার কাছ থেকে কোনোদিন এতটুকু ভালোবাসা বা গুরুত্ব পায়নি বরং
সারাক্ষণ ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়েছে। আজ যেকোনো ভাবেই হোক তাকে ঠকাতে ভালোই লাগছে
মায়ে। এতে করে মায়ের ভেতর একটা কন্যা সন্তান বাসনা প্রবল হতে থাকে। সে মনে প্রাণে
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল যে কন্যা সন্তানের প্রতি এই লোকটার এত অবজ্ঞা আল্লাহ
যেন তাকে সেই কন্যা সন্তানই দান করেন। কন্যা সন্তান জন্মের মধ্যে মা তার বিজয়
দেখতে পাচ্ছেন। স্বর্গে বসে হয়তো মায়ের এই আহ্বানের অপেক্ষাতেই আমি ছিলা। মায়ের এই
আকুল আহ্বানে হয়তো আমার আর সাড়া না দিয়ে উপায় ছিল না। নির্দিষ্ট দিনে ঘর আলো করে,
না না খানিকটা ভুল হলো। ঘর আলো করে নয়, মায়ের কোল আলো করে আমার জন্ম হলো। সেই
সঙ্গে পুরো ঘরে নেমে এলো ঘোর অমানিষা। সেই অমানিষার ছায়া পড়লো মা ছাড়া ঘরের বাকি
সদস্যদের উপর। আতুরঘরে প্রসব যাতনার রেশ কাটতে না কাটতেই আমার মায়ের উপর শুরু হলোঅকথ্য নির্যাতন। মায়ের পেটের মধ্যে ঐ নর পিশাচটা গিয়ে সজোরে লাথি মারছে আর বলছে, ঐ
মাগী, তোর বিয়ানের সখ অইছে- একটা পোলা বিয়াইতে পারলি না? তোরে এত কইরা কইলাম একটা
পোলার কতা, তুই হুনলি না? মা তখন বেহুসের
মত প্রায়। একেতো মাত্র প্রসব করলো তার ওপর উদরে সজোরে লাথি। মা বোধহয় পণ করেছিল যে
আমার জন্য তাকে বেঁচে থাকতেই হবে তাই সে যাত্রায় এত কিছুর পরও বেঁচে রইলেন। নর পিশাচের
অত্যাচার থেমে নেই। সদ্যজাত এ আমাকে নিয়ে মায়ের যাওয়ার জায়গা বেশ স্তিমিত ছিল। তাই
বেহুশ হয়েও মা আমাকে কোলে নিয়ে এক কাপড়ে কোনো রকম তার বাপের বাড়ি এসে উঠলেন। সেদিন
ছিল আমার মায়ের প্রথম মুক্তি। তবে এ মুক্তি মাকে আরেক যুদ্ধে নামিয়ে দিল। মা তার
বাবার পায়ে পড়ে নিজের জন্য নয় বরং সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে বললো আমাকে দুটো
সপ্তাহ থাকতে দিন বাবা। আমি কথা দিচ্ছি, কেবল দুটো সপ্তাহ পার হলেই আমি যেদিকে
পারি চলে যাব। সেদিন নানাভাই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বললো, আমাকে আর
অপরাধি করিস না মা। আমি তোর অক্ষম বাবা। এতগুলো লোকের দুবেলা খাবার জোটাতে পারিনে
বলে এখানে তোর আসাটা আমি পছন্দ করতাম না। তাই বলে এই অবস্থায় ঐ নর পশুটা তোর সঙ্গে
এমন আচরণ করল তা আমি কীভাবে মেনে নেই মা? এতটা পাষণ্ড মানুষ ক্যামনে হয়? তুই
চিন্তা করিস না মা। দু বেলা ভাত দিতে পারি বা না পারি আমরা সবাই যেমন খাই তুইও
তেমন খাবি। এখানে যতদিন খুশি তুই থাক। তারপর শুনেছি, নানাভাই নাকি আমার মাথায় হাত
বুলিয়ে বলেছিল, তুমি দুনিয়াতে আসা মাত্রই যে ঘটনা দেখলা নানাভাই হেইডা সারাজীবন
মনে রাইখ্যো। এর বদলা একদিন তোমারে নিতেই হইব নানাভাই। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এক ঝলক হাসি হেসে দিয়ে
বললো, দেখছো, কী চান্দের মত হইছে আমার নানাভাই। ভাঙ্গা ঘরে এমন চান্দের আলো পড়লে
না খাইয়াও শান্তিরে মা।
বাপের বাড়িতে চলে আসার পর সেই নরপশুটি একটিবারের জন্যও
খোজ নিতে আসেনি। মাও খোজ নেয়নি। মা যেন এক নতুন স্বপ্নে বিভোর। ধীরে ধীরে আমি বড়
হতে লাগলাম। জ্ঞান হবার পর থেকে মাকে কখনো বিশ্রাম নিতে দেখিনি। মা কখন খাবার খেত,
সেটাও কহনো চোখে দেখিনি। শুধু দেখেছি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে। রোজ রাতে আমি যখন
খাবার খেয়ে ঘুমুতে যেতাম তখন দেখতাম মা কাঁথা অথবা জামা সেলাই করছে। আবার যখন খুব
ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম তখনও দেখতাম মা একই কাজ করছে। মা কি কখনো ঘুমাতো? এই প্রশ্নটি
ছোটবেলায় মাথায় না আসলেও যখন আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি, টের পাচ্ছি মায়ের এই পরিশ্রম
তখন এসেছিল। কিন্তু উত্তর খুজে পাইনি। এত পরিশ্রমের পরও মাকে কখনো অসুস্থ হতেও
দেখিনি। সত্যিই কি মা কখনো অসুস্থ হননি, নাকি আমাদের বুঝতে দেননি। আজ হাজার প্রশ্ন
উকি মারে। মায়ের এ লড়াইটা একটু একটু করে বুঝতে পারতাম কিন্তু কী-ইবা করতাম আমি
ঐটুকুন বয়সে!
মা আমাকে একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে
দিলেন। শুরু হলো আমার শিক্ষায় পথচলা। মা তেমন পড়াশোনা জানতেন না। তবে ঐটুকুন বয়সে
আমার পড়াগুলো দেখিয়ে দিতে পারতেন। তাছাড়া অন্যান্য শিক্ষা মা বেশ ভালো ভাবেই দিতে
পেরেছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে তার লড়াইয়ের গল্প শোনাতেন যেনআমি সব জেনে বুঝে মায়ের সংগ্রামের সাথী হতে পারি। আমি তখন মায়ের সব কথা বুঝিনি।
তবে যতটুকু বুঝেছি আমি তা পালন করার চেষ্টা করেছি। মা বলেছিল, ভালোভাবে পড়াশুনা
করলে নাকি মায়ের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে। আমার পড়াশুনার সঙ্গে মায়ের দুঃখ-অষ্ট
দূর হওয়ার সম্পর্কটা তখন বুঝিনি। এটা বুঝতাম যে আমার মা কখনো মিথ্যা কথা বলেন না। কিছু
কিছু মিথ্যে বলতেন যেগুলো ছিল সত্যের চেয়ে কঠিন। ঐ মিথ্যেগুলো মায়ের প্রতি ভক্তি
আরো বাড়িয়ে দিত। মায়ের নির্দেশে আমি মন দিয়ে পড়াশুনা করতে লাগলাম। প্রতি ক্লাসে
প্রথম হতাম। যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা দিলাম জানলাম আমাদের পুরো
জেলার মধ্যে আমি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। আমি অবশ্য এ
সাফল্যের মর্ম তখন বুঝিনি। কিন্তু মা বুঝেছিল।মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ অশ্রু
ঝরিয়ে বলেছিল, আমি জানতাম মা, তুই পারবে। তুই আমার সব কষ্ট দূর করতে পারবি। আমি
তখনো বুঝিনি যে আমি কী এমন করেছি। তবে মাকে খুশি করতে পেরেছি এটা বুঝেছিলাম। আমার
নিজের উপর তখন একটা আস্থা জন্ম নিল। বুঝেছিলাম
মা সেদিন পড়াশুনা করে দুঃখ কষ্ট দূর করা বলতে এটাকেই বুঝিয়েছিলেন। তারপর
স্থানীয় এক মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হলা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমার প্রাথমিকের
ফল শুনে খুবই খুশি হলেন। স্কুলে আমার যাবতীয় বেতন ও আনুসঙ্গিক খরচ মাফ করে দিলেন। আমার
পড়াশুনার আর কোনো খরচ লাগল না। বরং সমাপনীতে ভালো ফল করার কারণে সরকার আমাকে প্রতি
মাসে কিছু টাকা দিচ্ছিল। সেই টাকা আমি মায়ের হাতেই তুলে দিলাম। মনে অনেক শান্তি
পেলাম আমার পড়াশুনার জন্য মায়ের খরচ নিয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হবে না ভেবে। বরং
মাস শেষে কিছু টাকা মায়ের হাতে তুলে দিতে পেরে। তখন যে কত গর্ব হচ্ছিল! এই টাকা
কয়টা মায়ের হাতে পেয়ে মায়ের কতটুকু উপকার বা সহযোগিতা হয়েছিল জানি না। তখন আমি
মায়ের সেই কথার মানে আরো ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম যে পড়াশুনা করলে কীভাবে মায়ের
কষ্ট দূর হয়! যদি সামনে আরো ভালো করে পড়াশুনা করি তাহলে হয়তো এভাবে মা খুশি হবে
এবং মাকে আরো বেশি করে টাকা দিতে পারব। এই লোভ আমাকে পেয়ে বসলো। তাই আমার একমাত্র
ধ্যান হয়ে উঠলো পড়াশুনা। আমার পড়াশুনায় আগ্রহ দেখে আমার শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত মায়ের
সঙ্গে গর্ব করে কথা বলতেন। আমি বুঝতে পারছিলাম যে সকল শিক্ষকের চোখে আমি একটি
বিশেষ স্থানে আছি। সকলের আশা ও বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে মাধ্যমিকেও সমগ্র বোর্ডে
প্রথম স্থান অর্জন করাম। এবার মায়ের চোখে মুখে খুশিতে আত্মহারা হবার দশা দেখতে
পাই। সেই সঙ্গে এবার মায়ের চোখে কিছুটা হতাশাও দেখততে পাই। এত ভালো ফল করা মেয়েকে
তিনি কোথায় কীভাবে পড়াশুনা করাবেন এই ভাবনায় মা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। এত খরচই বা
কোথা থেকে জোগার করবেন। এসব ভাবনা মাকে উদ্বিগ্ন করছিল। নানাভাই মাকে সান্ত্বনা
দিয়ে বললেন, আমার এই নানাভাইকে নিয়ে তুই একদম দুশ্চিন্তা করবি না। দেখলি তো সেই
ছোট থেকে মেট্রিক পর্যন্ত পাশ করলো, তোর এক টাকাও খরচ করেছে? বরং এই বয়সেই তোর
হাতে টাকা তুলে দিয়েছে। আমার সেই
নানাভাইকে নিয়ে তুই চিন্তা করছিস? তুই এখনো বুঝিসনি যে আমার এই নানাভাই একটা
সম্পদ। দেশের সম্পদ। দেশের সম্পদ দেশই রক্ষা করবে। বলতে বলতে এক কোট-প্যান্ট পরা
এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলেন আমার মায়ের কুড়েঘরের সামনে। এসে আমার মাকে পরিচয় দিয়ে
মায়ের পরিচয়টুকুও নিলেন। পরিচয় পেয়ে আমার মাকে দুহাত করযোগে ভক্তি জানালেন। বললেন,
আপনাকে দেখলেই বুঝা যায় আপনি একজন রত্নগর্ভা নারী। আপনার গর্ভের রত্নটির পরিচর্যার
ভার আমাকে দিলে আমি ধন্য হতাম মা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আপনি কী করে জানলেন যে
আমাদের সাহায্য দরকার? তখন ভদ্রলোকটি বললেন, ম্যাডাম আমি আপনার সাহায্য দরকার একথা
জেনে আসিনি। পত্রিকায় আপনাদের মা-মেয়ের লড়াই এবং সাফল্যের কাহিনি জেনে এসেছি। মনে
হয়েছে আপনার মেয়ের জন্য কিছু করতে পারলে আমার জীবন ধন্য হবে। আমার মা ভদ্রলোককে
যথেষ্ট সম্মান জানিয়ে প্রত্যাক্ষাণ করে দিলেন। জানালেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু
মশাই, আমার ও আমার মেয়ের লড়াইয়ে কাউকে সহযোদ্ধা হিশেবে চাই না। তারপর লোকটি চলে
গেলো। এভাবে অনেকেই এসেছিলেন আমাকে সাহায্য করতে। মা সবাইকে ফিরিয়ে দিলেন। নানাভাই
বললো, এ তুই কী করছিস মা? তোর মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করবি না? আমার জ্ঞানী মা
সেদিন যে জবাব দিয়েছিল নানাভাইকে তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ্য মনীষীদের পক্ষেও হয়তো দেয়া
সম্ভব নয়। মা সেদিন বলেছিল, ওর উজ্জ্বল
ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ফিরিয়ে দিচ্ছি বাবা। এতদিন তার জন্য আমার লড়াই দেখে সে যতটা
জেদ নিয়ে পড়াশুনা করেছে আজ যদি সে এত সহজে সবকিছু পেয়ে যায় তাহলে তার মনে সেই
জেদটা আর থাকবে না বাবা। তাই এতদিন সে যেই ফল অর্জন করেছে সেটাও আর থাকবে না বাবা।
তাই ওকে এতদিনের মত কষ্ট করেই পড়াশুনাটা করতে দিন। তাতে তারই ভালো হবে। তাছাড়া তার
অর্জনে অন্য কারো দান জড়িয়ে থাকুক তা আমি চাইনা বাবা। কষ্ট করে নিজের মেধা দিয়ে
যতটুকু পাচ্ছে তা-ই-বা কম কিসে? নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে জয়ী হোক। তাতে তৃপ্তি
থাকবে। আমার জ্ঞানী মায়ের সেদিনের সে কথার জন্য তাকে স্যালুট জানাই। অন্যের দানে
পড়াশুনা করলে হয়তো আজ এই তৃপ্তিটুকু পেতাম না। তারপর আমার জেদি, অহংকারী মায়ের
জন্য কারো সাহায্য নেয়া হলো না। বারবার এমন ভালো ফলাফলে আমি সরকারিভাবেই শুহরের
ভালো কলেজে এইচএসসি পড়ার সুযোগ পেলাম। সঙ্গে যাবতীয় খরচ ফ্রি, এমনি হোস্টেলে থাকা
খাওয়া পর্যন্ত ফ্রি। কলেজ ফান্ড থেকে আন্যান্য খরচের জন্য কিছু টাকা করেও দেয়া
হচ্ছে। আমি সেই টাকার কিছু নিজের জন্য খরচ করে বাকিটুকু মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। আমার
জেদি মা, আমার মূর্খ মায়ের জন্যই এসব হলো। আত্মসম্মানে ভরপূর এ মায়ের জন্য আমার শতকোটি প্রণাম। তিনি যদি অন্যের দানের কাছে আমার স্বপ্নকে বিক্রি করে দিতেন তাহলে
নিজের যোগ্যতার এ দান গ্রহণ করার হয়তো সুযোগ পেতাম। তাছাড়া সারা জীবন নিজের
মুখোমুখি হয়তো সোজা হয়ে দাড়াতে পারতাম না। ক্রমে আমি এইচএসসিতেও ভালো ফলাফল অর্জন
করলাম। তারপর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সঙ্গে আমি লন্ডন সরকারেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট
করলাম। লন্ডন সরকারের লন্ডনের তথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম কিং
কলেজে স্কলারশিপ সহ ডাক্তারি পড়ার প্রস্তাব দিলেন। সেই সঙ্গে একটি পার্টটাইম
চাকরি। সব কিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত চলছে। আম আমার স্বপ্ন পূরণের চূড়ান্ত ধাপ এর
হাতছানিকে প্রত্যাক্ষাণ করলাম না। মাকে ছেড়ে মায়ের দেয়া আশীর্বাদ সঙ্গে নিয়ে চলে
এলাম লন্ডনে। এখানে আমি মেডিসিন এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই
সার্টিফিকেট হাতে চলে আসবে। সার্টিফিকেট হাতে পেয়েই আমি আমার সেই ভিখারিণী মা,
অভাগিণী মায়ের কাছে চলে যাব। এখানে এসে
প্রতিটি দিন আমি আমার মাকে মিস করেছি। মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি রোজ একবার, ফোনে।
কিন্তু মোবাইল কলে আমার তৃপ্ত নয়। তিনি চান আমি যেন সপ্তাহে অন্তত একটা চিঠি লিখি
তাকে। মোবাইলে কথা বললে নাকি যতক্ষণ কথা হয় শুধু ততক্ষণই এর রেশ থাকে। কিন্তু চিঠি
লিখলে বারবার পড়া যায়। তাছাড়া চিঠিতে যতটা আবেগ প্রকাশ পায়, মোবাইল কলে ততটা নয়। তাই
আমার মাকে আমি প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখেছি। সত্যিই চিঠিতে যে আবেগ প্রকাশের সুযোগ
থাকে, মোবাইল কলে নয়। আমার মা সেকেলে হয়েও আধুনিকতার চেয়েও অতি আধুনিক। অতি
রোমান্টিক। বিশ্বাস করুন, মাকে যতগুলো চিঠি লিখেছি , সবগুলো আমি কপি করে নিজের
কাছেও রেখেছি। আরো কিছুদিন দেরি হবে মায়ের কাছে যেতে। যাওয়ার আগে আরেকটা চিঠি লিখে
ফেললাম মাকে। আর কোনো দিন মাকে চিঠি লেখা হবে না হয়তো। কারণ আমি আর আমার মাকে ছেড়ে
কোথাও যাব না এক মুহুর্তের জন্য। তাই শেষবারের মত লেখলাম।
মা
আজ পাঁচ বছর হলো তোমাকে ছেড়ে এই লন্ডনে আছি। আর বেশিদিন
তোমাকে একা ফেলে রাখব না মা। অল্প দিনের মধ্যেই তোমার দুঃখের দিনের নটে গাছটি
মুড়িয়ে রূপকথার গল্পের শেষ লাইনের মত দুই মা-মেয়েতে সুখে শান্তিতে বসবাস করব।
মনে আছে মা, মেয়ে প্রসব করাতে আমার নিষ্ঠুর বাবা তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কী অমানবিক অত্যাচার করেছিল। তোমার শ্বশুর –শাশুড়ি তোমাকে ঘরে ঠাই দেয়নি। আমার জ্ঞান হওয়ার পূর্বের ঘটনা তোমার কাছ থেকে শুনে শুনে বড় হয়েছি মা। তারপর জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখছি মাকে মানুষ করার জন্য ভাগ্যের সঙ্গে তোমার সেকি লড়াই! কখনো কারো বাড়িতে কাজ করেছো, কখনো ভিক্ষা করে আমার খাবার এবং পড়াশুনার খরচ চালিয়ে গেছো মা। হেন কোনো কাজ নেই যা আমার জন্য করোনি। মেয়ে প্রসবকরাতে তোমাকে যে অকাট্য অপমান করা হয়েছে- তোমার নারীত্বে সেটা লেগেছে; তা আমি বুঝেছিমা। আর তাই তুমি আমাকে মেয়ে নয়, মানুষ করে তুলতে বদ্ধ পরিকর হলে। আমিও তোমার যন্ত্রণার ভাগীদার মা। আমি তোমাকে সমাজে একজন আদর্শ মা রূপে তুলে ধরতে চাই মা। সকল স্বামী যেন তোমাকে দেখে তাদের স্ত্রীদের কন্যা সন্তান প্রসব করতে উৎসাহ দেয় - আমি সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো মা। আমার জন্য তোমার এ লড়াই দেখে আমি মন দিয়ে পড়াশুনা করে প্রতি ক্লাসে প্রথম হয়েছি। বৃত্তি পেয়েছি। যাতে আমার পড়াশুনার খরচ চালাতে তোমার কষ্ট না হয়। নিজের বৃত্তির টাকায় পড়াশুনার খরচ চালিয়েছি। তখন ঐটুকু বয়সে তোমার মেয়ে হয়ে এইটুকু বুঝেছিলাম যে, আমাকে নিয়ে তোমার যে স্বপ্ন , সেই স্বপ্ন পূরণে আমি এভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি। সকল পরীক্ষায় বোর্ড পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে সরকারি সহায়তায় আমি লন্ডনে ডাক্তারি পড়তে আসি। আমার খুব মনে পড়ে মা, আমাকে সেদিন তুমি অন্যের সাহায্য নিয়ে পড়াশুনা করতে দাওনি। নিজের আত্মসম্মান ও মেরুদণ্ডকে যেন কারো কাছে নত না করি। তোমার সেই পদক্ষেপে এতটুকু ভুল ছিল না মা। সেদিনের জন্য আজ তোমাকে নিয়ে আরো বেশি গর্ব করি মা। আজ তোমার স্বপ্ন সার্থক হয়েছে মা। খুদ শীঘ্রই আমি তোমার কাছে ফিরে আসব। ফিরে এসে তোমার নামে একটা হাসপাতাল দেব মা। সেখানে গরীব-দুঃখীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করাবো।
জানো মা! এখানে এসে সবার সঙ্গে তোমার গল্প করেছি। ওরা তোমাকে দেখতে চাইলে তোমার ছবি দেখিয়ে গর্ব করে বলেছি, এই আমার মা, আমার ভিখারিণী মা, আমার অভাগিণী মা! সবাই তোমাকে সালাম জানিয়েছে মা। বলো মা, আমি ঠিক বলিনি! তুমিতো আমার সেই ভিখারিণী মা যে আমার জন্য নিজের জীবনের সব সুখ ত্যাগ করেছো। আজ তোমার নিজেকে দেখিয়ে দেয়ার দিন এসেছে মা, যারা তোমার গর্ভকে খর্ব করেছিল। তোমার মাতৃত্বকে যারা অবমাননা করেছিল তাদের আজ শুধু দেখিয়ে দেয়ার দিন মা। দুঃখ করো না। আর মাত্র দু মাস পর আমি আসছি মা। তোমার পথ চাওয়ার দিন ফুরিয়েছে। তোমার জন্য সুখের সাম্রাজ্য বানিয়ে তোমাকে রানীর আসনে বসিয়ে রাখবো মা। আর আমি হবো তোমার সেবাদাসী। ভালো থেকো মা। আজ আর নয়।
ইতি
তোমার কন্যা













0 Comments